Monday, August 8
Shadow

মাহরাম ও গায়রে মাহরামদের নিকট নারীদের পর্দা কেমন হবে?

মাহরাম ও গায়রে মাহরামদের নিকট নারীদের পর্দাঃ

যৌনাঙ্গকে হিফাজত করতে হবে।যৌনাঙ্গকে হিফাজত করা ও সংযত রাখা পর্দার বড় বিধান। আল্লাহ তা‘আলা নারী-পুরুষ উভয়কে যৌনাঙ্গ হিফাজত করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছেন।যৌনাঙ্গকে হিফাজত করার অর্থ হল – কুপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করার যত পন্থা প্রক্রিয়া আছে, সবগুলো থেকে যৌনাঙ্গকে দূরে রাখা। এতে ব্যভিচার, সমমৈথুন, হস্তমৈথুন, ঘর্ষণ ইত্যাদি সব কাম চরিতার্থমূলক কর্ম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

কাম প্রবৃত্তির প্রথম ও প্রারম্ভিক কারণ হচ্ছে দৃষ্টিপাত করা ও দেখা এবং সর্বশেষ পরিণতি হচ্ছে ব্যভিচার।

সূরাহ নূরের ৩১ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা এসব বিষয় জোড়ালোভাবে নিষিদ্ধ করে হারাম করে দিয়েছেন। সেই সাথে এতদুভয়ের অন্তর্বতী ভূমিকাসমূহ যেমন – পরস্পর কথাবার্তা বলা, শোনা, স্পর্শ করা, চিঠিপত্র বা এসএমএস আদান-প্রদান করা ইত্যাদি সবই নিষিদ্ধ ও হারাম পরিগণিত হয়েছে।

গাইরে মাহরামদের সংশ্রব থেকে দূরে থাকতে হবে।নারীদের পর্দা রক্ষার জন্য বিশেষভাবে জরুরী হল – সকল বেগানা পুরুষের সংস্রব থেকে দূরে থাকতে হবে। এ জন্য মাহরাম ও গাইরে মাহরামদের সম্পর্কে পূর্ণরূপে অবগত হওয়া তাদের কর্তব্য।

নিম্নে তা আলোচনা করা হলোঃ

যেসব পুরুষদেরকে দেখা দেয়া নারীদের জন্য জায়িয নয়, তারা হচ্ছে বেগানা বা গাইরে মাহরাম।

নিম্নে তাদের কিছু ফিরিস্তি তুলে ধরা হলঃ

১। রক্তের সম্পর্কহীন যে কোন বেগানা পুরুষ – নিজ গ্রামের লোক হোক বা ভিন্ন গ্রামের এবং চাই একই স্কুল বা কলেজ বা ভার্সিটির হোক না কেন, কিংবা ক্লাসমেট বা সহপাঠি হোক না কেন বা একই অফিসে চাকুরী করুক না কেন, তারা গাইরে মাহরাম।

২। ধর্মবাপ, ধর্মভাই, উকিল বাপ, মুখডাকা বাপ-ভাই বা মামা-চাচা, শিক্ষক, পীর প্রমুখ গাইরে মাহরাম।

৩। দুলাভাই।

৪। খালু, ভাসুর ও ভাসুরের ছেলে।

৫। দেবর ও দেবরের ছেলে।

৬। ননদের স্বামী ও তার ছেলে।

৭। চাচার ছেলে/চাচাতো ভাই।

৮। জেঠাতো ভাই।

৯। মামার ছেলে/মামাতো ভাই।

১০। স্বামীর অন্য যত প্রকারের ভাই বা দুলাভাই আছে।উল্লিখিত তারা সকলেই বেগানা।

তাদের সাথে পর্দা করা ফরজ। এক কথায়, যাদের সাথে বিবাহ বৈধ, তারা সবাই গাইরে মাহরাম। তাই তাদের সাথে দেখা দেয়া জায়িয নয়।

আর যাদের সাথে বিবাহ জায়িয নয়, বরং তা চিরতরে হারাম, তাদেরকে মাহরাম বলা হয়।

মেয়েদের জন্য যারা মাহরাম অর্থাৎ যাদের সাথে দেখা সাক্ষাত জায়িয, তারা হচ্ছে –

১। স্বামী।

২। স্বামীর পিতা, দাদা যত উপরে যাক।

৩। আপন পিতা, দাদা যত উপরে যাক।

৪। আপন ভাই, বিমাতা ভাই, বৈপিত্রিক ভাই।

৫। সতীনের ছেলে।

৬। আপন মামা।

৭। আপন চাচা।

৮। আপন ছেলে।

৯। আপন ভাইয়ের ছেলে (যত নীচে যাক)।

১০। আপন ভগ্নির পুত্র (যত নীচে যাক)।

এছাড়াও নিম্নে বর্ণিত ব্যক্তিগণের সাথে নারীর দেখা দেয়া জায়িয –

১০। নাবালিগ ছোট ছেলে – নারীদের বিষয়ে এখনো যার বুঝ হয়নি।

১১। ঈমানদার স্ত্রীলোক। (কাফির-বেদ্বীন স্ত্রীলোকের সঙ্গে দেখা দেয়া দুরস্ত নয়।)

১৪। অশীতিপর বৃদ্ধ যার একেবারে চাহ্ওয়াত নেই এবং স্ত্রীলোকের প্রতি কোনরকম আসক্তি নেই।

উল্লিখিত লোকদের সাথে নারীর দেখা দেয়া জায়িয অর্থাৎ দেখা দিলে কোন গুনাহ হবে না।

এদের ছাড়া সকল পুরুষ থেকে নারীদের পর্দা করতে হবে। তা ঘরে হোক বা বাহিরে হোক।তাদের কারো সামনে নারীর পর্দা ছাড়া আসা বা দেখা দেয়া জায়িয হবে না।

আমাদের দেশে মনে করা হয়, স্বামীর ভাইদের সামনে বা স্বামীর আত্মীয়দের সামনে বা নিজ আত্মীয়দের সামনে মুখ খোলা জায়েয। কিন্তু তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ইসলাম বহির্ভূত কাজ।

ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের বালেগ হওয়ার বয়সসীমা ও আলামত শরীয়তের পক্ষ থেকে নির্ধারিত রয়েছে। কোনো ছেলে বা মেয়ের মধ্যে বালেগ হওয়ার নির্দিষ্ট আলামত পাওয়া গেলে বা নির্দিষ্ট বয়সসীমায় পৌঁছলেই তাকে বালেগ গণ্য করা হবে এবং তখন থেকেই শরীয়তের হুকুম-আহকাম তার উপর প্রযোজ্য হবে।

ছেলেদের বালেগ হওয়ার আলামত হল:

ক) স্বপ্নদোষ হওয়া।

খ) বীর্যপাত হওয়া।

আর মেয়েদের বালেগ হওয়ার আলামত হল:

ক) স্বপ্নদোষ হওয়া।

খ) হায়েয (ঋতুস্রাব) আসা।

গ) গর্ভধারণ করা।

বালেগ হওয়ার উপরোক্ত নির্দিষ্ট আলামত যদি কোনো ছেলে বা মেয়ের মধ্যে পাওয়া না যায় সেক্ষেত্রে উভয়ের বয়স যখন হিজরী বর্ষ হিসাবে পনেরো বছর পূর্ণ হবে তখন প্রত্যেককে বালেগ গণ্য করা হবে এবং পনেরো বছর পূর্ণ হওয়ার পর কোনো আলামত পাওয়া না গেলেও সে বালেগ বলেই বিবেচিত হবে।

প্রকাশ থাকে যে, কোনো ছেলে বা মেয়ের সাথে শরয়ী পর্দা করার হুকুম প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার সাথে সীমাবদ্ধ নয়। যেমনটি কেউ কেউ ধারণা করে থাকে। বরং প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পূর্বেই যখন কোনো ছেলের নারী-পুরুষ সম্পর্কের বিষয়ে বোঝার বয়স হয়ে যায় তখন থেকেই তার সাথে পর্দা করতে হবে।

আর মেয়েদের পর্দার বয়স শুরু হয় তার শরীরে মেয়েলী বৈশিষ্ট্য প্রকাশ হওয়ার সময় থেকেই। যখন তাকে দেখলে কোনো পুরুষ আকর্ষণ অনুভব করে।

পিতা-মাতার কর্তব্য হল এমন বয়সী ছেলেমেয়েদের পর্দার ব্যাপারে সচেতন থাকা। -আল ইনায়া শারহুল হেদায়া ৮/২০১; আদ্দুররুল মুখতার ৬/১৫৩; তাফসীরে কুরতুবী ১২/১৫১

নারীদের মাহরামদের নিকট তাদের পর্দা কেমন হবে?

উপরে বর্ণিত নারীদের মাহরাম যেমন: আব্বা, ভাই ও ভাইয়ের ছেলে, তাদের সামনে নারীরা পুরো শরীর ঢেকে রাখবে, গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢিলা-ঢালা কাপড় (মেক্সি) পড়বে। ওড়না পড়বে যা মাথা থেকে বক্ষদেশ পর্যন্ত ঢেকে রাখবে। তবে যা এমনিতেই প্রকাশ পায় যেমন: চেহারা, মাথা, কনুইসহ দু‘হাত, দু পায়ের পাতা এগুলো ব্যতীত।

শায়খ ইবনে বায রহ. বলেন: “বর্তমান যুগের অবস্থায় মানুষের দ্বীন-ঈমান দুর্বল, আল্লাহর ভয় কম, হারাম কাজের প্রসার বেশি, তাই নারীরা তাদের মাহরামের সামনে মাথা ঢেকে রাখা বেশি নিরাপদ ও উত্তম এবং এর দ্বারা ফিতনা থেকে বেঁচে থাকা যায়। আর পাশাপাশি নারীরা যেন তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার কৌশল ও পদ্ধতি অবলম্বন করে লাজ-লজ্জা বজায় রেখে চলাফেরা করবেন।” আর তারা তাদের পায়ের নালা ও হাতের বাহু ঢেকে রাখবে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর যা সাধারণত: প্রকাশ পায়, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ করবে না। তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে। আর তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, নিজদের ছেলে, স্বামীর ছেলে, ভাই, ভাই এর ছেলে, বোনের ছেলে, আপন নারীগণ, তাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে, অধীনস্থ যৌনকামনামুক্ত পুরুষ অথবা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া কারো কাছে নিজদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। আর তারা যেন নিজদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা-চলাফেরা না করে।” [সূরা আন-নূর: ৩১]

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে বুঝার তাওফিক দিন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.